Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!
বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯

নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা হয় যেভাবে

সিএনবি ডেস্ক  ২০১৯-০৪-১৪ ০৯:৩৪:৪৫  

ডেস্ক নিউজ:

‘ওস্তাদ, কিছু একটা করা দরকার। আপনার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা দিয়ে আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে। মাদ্রাসার সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।’ গত ৪ এপ্রিল (২০১৯) যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে তাকে এসব কথা বলে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীমসহ তাদের অন্য সহযোগীরা। তখন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা তার অনুগত শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দিলেন, ‘করো। তোমরা কিছু একটা করো।’ নুসরাত জাহান রাফি অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের দায়ের করা হত্যা মামলার অনুসন্ধানে নেমে এসব তথ্য জেনেছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই এর কর্মকর্তারা।

তারা জানান, অধ্যক্ষের কাছ থেকে সম্মতি পাওয়ায় খুশি হয় শামীম। রাফিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় প্রতিশোধের স্পৃহা জাগে শামীমের মধ্যে। ওস্তাদের নির্দেশনা পাওয়ার পর নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদের পরদিন মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বসে নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে।

শনিবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনেও এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেন ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাফিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল শাহাদাত হোসেন শামীম। কিন্তু, রাফি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এজন্য এর আগে একবার শামীম ও তার সহযোগীরা রাফিকে চুনকালি মেরেছিল। যে কারণে রাফিকে বেশ কিছুদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছিল পাহাড়তলী হাসপাতালে। তবে সে ঘটনা গণমাধ্যমে আসেনি। সে ঘটনা তারা সামাল দিয়ে ফেলেছিল। এরপর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার দ্বারা শ্লীলতাহানির ঘটনাও তারা সামলিয়ে ফেলেছিল। এটাই রহস্য। এতোসব ঘটনা ঘটিয়েও তারা পার পেয়ে গিয়েছিল। সে কারণে তারা মনে করেছিল, এগুলো ঘটানো কোনও বিষয় নয়। আগুনে পুড়িয়েও তারা পার পেয়ে যাবে।

ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, কারাগারে সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করে ৫ এপ্রিল পরিকল্পনায় বসে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন। পরিকল্পনার শুরুতেই রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য দু’টি কারণ তারা সামনে নিয়ে আসে। একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করে আলেম সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা। অন্যটি হচ্ছে শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে সেটাও বলে সে। এরপর তারা রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। সেটা বাস্তবায়নের জন্য দুই মেয়েসহ আরও পাঁচজনকে বিষয়টি অবহিত করে তারা। তারা প্রত্যেকেই ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ওই পাঁচ জনের মধ্যে ছিল দু’জন মেয়ে।

ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, দু’টি মেয়ের মধ্যে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনটি বোরখা ও কেরোসিন জোগাড় করে নিয়ে আসার জন্য। ওই মেয়েটি তিনটি বোরখা ও পলিথিনে করে কেরোসিন নিয়ে এসে শামীমের কাছে হস্তান্তর করে। মাদ্রাসাটি একটি সাইক্লোন সেন্টারে। সেখানে সকাল সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। ক্লাস শেষে কেরোসিন ও বোরখা নিয়ে তারা ছাদে চলে যায়। ছাদে দু’টি টয়লেটও ছিল। আলিম পরীক্ষা থাকায় সেই টয়লেটে তারা লুকিয়ে থাকে। পরে পাবলিক পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চম্পা কিংবা শম্পা নামের একটি মেয়ে রাফিকে বলে, ছাদে কারা যেন তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করছে। তখন রাফি দৌড়ে ছাদে যায়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা শামীমসহ বোরকা পড়া চারজন রাফিকে ঘিরে ফেলে এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেবে কিনা জানতে চায়। রাফি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তারই ওড়না দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলে। এ সময় বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহ করা মেয়েটিও সেখানে ছিল। হাত বেঁধে রাফির শরীরে আগুন লাগিয়ে তারা দ্রুত নীচে নেমে অন্যদের সঙ্গে মিশে যায়।

তিনি জানান, ছাদ থেকে চিৎকার করলেও বাইরে থেকে সে আওয়াজ শোনা যায়নি। কারণ, অনেকটা ফাঁকা জায়গায় সাইক্লোন সেন্টারটি।

ডিআইজি বনজ কুমার আরও জানান, ঘটনার সময় মাদ্রাসার বাইরের গেটে নুর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ ৫জন বাইরের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। আরও একজনের নাম পাওয়া যায় যে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ঘটনা ঘটিয়ে শামীমরা বাইরের লোকদের মধ্যে মিশে যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে সবাই গা ঢাকা দেয়।

শ্লীলতাহানিসহ রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও ছয়জনকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে পিবিআই। এছাড়াও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয় আরও ছয়জনকে।

গ্রেফতারদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামিরা হচ্ছে অধ্যক্ষ এস.এম সিরাজ উদ্দৌলা (৫৫), ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯), একই মাদ্রাসার শিক্ষক আফছার উদ্দিন (৩৫) এবং সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫)। এছাড়াও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে মো. আলা উদ্দিন, কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা ও নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়াকে।

ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘আগুন লাগার পর রাফি কীভাবে নিচে নেমে এলো এমন একটি বিতর্কিত প্রশ্ন আমি উঠিয়েছিলাম। আগুন লাগার পরে ছাদ থেকে রাফি সিঁড়ি বেয়ে নামলো কেমনে। তার তো দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা। এ প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া গেছে। কারণ, সেটা একটা সাইক্লোন শেল্টার ভবন। এর ছাদের চার পাশের দেয়াল প্রায় ৫ ফুট উঁচু। কোনও সুস্থ মানুষও ইচ্ছা করলে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামতে পারবে না। সাইক্লোন সেন্টার হওয়ার কারণে তাকে সিঁড়ি দিয়েই নামতে হবে। সিঁড়িগুলোও চওড়া।

তিনি বলেন, চারজন বোরখা পড়ার মধ্যে একজন গ্রেফতার হয়েছে। তাদের সবার নাম পাওয়া গেছে। পুরো ঘটনায় দু’জন মেয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। যাদের একজন বলেছিল নিশাতকে মারধর করেছে। আর বোরকা ও কেরোসিন যে সরবরাহ করেছিল সে ছাদে ছিল।

মন্তব্য করুন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন


ফেইসবুকে আমরা

বিজ্ঞাপন